ওই বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করেন।
বৈঠকে জানানো হয়, দেশে আগামী এক মাসের চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে। এছাড়া যেসব এলএনজি কার্গো ক্রয়াদেশ দেয়া হয়েছিল সেগুলোর বেশির ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এরই মধ্যে অতিক্রম করেছে। চলতি মার্চের জন্য মোট ১১টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে নয়টি এরই মধ্যে সংঘাতময় এলাকা পার হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক সম্পর্কে অবগত এমন এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সেখানে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করা হয়েছে। বৈঠকে জ্বালানি তেলের মজুদের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সেই সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের পথ খুঁজতে জ্বালানি বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানে হামলা ও চলমান সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ জিটুজি চুক্তি ও উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পরিশোধিত তেল আমদানির চুক্তি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগে দেশের জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা বিষয়ে জানতে চাইলে শনিবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বণিক বার্তাকে জানিয়েছিলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আগামী জুন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। পরিশোধিত জ্বালানি তেল মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে। এসব দেশ থেকে জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
বিপিসির চেয়ারম্যান এ সময় আরো জানান যে দেশে জ্বালানি তেলের রিজার্ভে কোনো সংকট নেই।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেহরানের পাল্টা হামলায় অস্থির হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। গতকাল ওমানের একটি বন্দরে তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল রয়টার্স জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তেলের দাম ব্যারলপ্রতি ১০ শতাংশ বেড়ে ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাত বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি হলে সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ থেকে ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
দেশে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজি আমদানির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ। বর্তমানে এসব দেশে ইরান ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ। রয়টার্স বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, তেহরান ওই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে সতর্কবার্তা দেয়ার পর অধিকাংশ ট্যাংকার মালিক, শীর্ষ তেল কোম্পানি ও বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান হরমুজ প্রণালি হয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন স্থগিত করেছে। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো জাহাজ মালিকদের জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় তারা আমলে নেবে না। এ পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো প্রভাব না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও দেশের বাজারে চলতি মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার। চলতি মার্চের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা ও অকটেনের দাম প্রতি লিটার ১২০ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রতি লিটার পেট্রল ১১৬ টাকা ও প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম ১১২ টাকাও অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্যনির্ধারণ নির্দেশিকার (সংশোধিত) আলোকে মার্চে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটারে এ দাম নির্ধারণ করল জ্বালানি বিভাগ।
চলমান পরিস্থিতিতে সরবরাহ রুট বা উৎপাদন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করে বাড়তে পারে। ইকুইরাস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করে, যা বিশ্ববাজারের প্রায় ৩ শতাংশ।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঠেকানো যাবে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। এ সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়। এর আগে বিনিয়োগপ্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস জানিয়েছিল, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তামূল্যে এর বড় প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে খাদ্য, পোশাক ও রাসায়নিকের মতো পণ্যে।
ইরান এখনো বিশ্বের শীর্ষ ১০ তেল উৎপাদনকারী দেশের একটি। দিনে ইরানের উৎপাদন ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি। ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে, যা বিশ্বে মোট তেলের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।
মাত্র ৫০ কিলোমিটার প্রস্থ ও তুলনামূলক অগভীর হরমুজ প্রণালি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন আংশিক বিঘ্ন ঘটলেও তেলের দামে ব্যারেলপ্রতি ২০ থেকে ৪০ ডলারের ‘ভূরাজনৈতিক প্রিমিয়াম’ যুক্ত হতে পারে। ফলে তেলের দাম আবারো ৯৫ থেকে ১১০ ডলার বা তারও বেশি হওয়ার শঙ্কা আছে।